শরীকে কুরবানি, অর্থায়ন ও আধুনিক মাসায়েল:
হযরত ইব্রাহীম আ. ও হযরত ইসমাইল আ. এর আত্মত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এসেছে কুরবানির বিধান।তাই সামর্থবানরা একাই কুরবানি দিতে পারেন।আর যাদের আর্থিক সচ্ছলতা নেই, তাদের জন্য সহজ বিধান হচ্ছে - শরিকানা বা যৌথ কুরবানি।
ভাগে বা শরিকানা কুরবানি বা দেওয়ার নিয়ম:
বড় পশু তথা উট,গরুও মহিষে এক থেকে সাত জন মিলে শরিকানা কুরবানি দিতে পারেন। আর ছোট পশু- দুম্বা, ছাগল ও ভেরা এ সব প্রানীতে এক জনের পক্ষ থেকেই দিতে হবে।
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. বর্ণনা-
خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ مُهِلِّينَ بِالْحَجِّ:فَأَمَرَنَا رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ أَنْ نَشْتَرِكَ فِي الْإِبِلِ وَالْبَقَرِ، كُلّ سَبْعَةٍ مِنّا فِي بَدَنَةٍ.
অর্থাৎ হজ্বের ইহরাম বেঁধে আমরা রাসূলুল্লাহ- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম - এর সাথে বের হলে তিনি আমাদেরকে উট ও গরুতে সাত ভাগে শরিক হওয়ার নির্দেশ দেন।
📚সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩১৮
আল্লামা বুরহান উদ্দিন আবুল মা’আলী হানাফী রহ. লিখেন-
الشاة لا تجزئ إلا عن واحد،وإن كانت عظيمة. والبقر والبعير كل واحد منهم يجزئ عن سبعة إذا كانوا يريدون بها وجه الله اتفقت جهات القربة أو اختلفت
অর্থাৎ বকরি শুধুমাত্র একজনের পক্ষ থেকে জায়েজ, যদিও অনেক বড় বকরি হয় ( তারপরও বকরি জাতীয় ছোট প্রাণীতে একের অধিক ব্যাক্তি শরিক হতে পারবে না।)
💢 আর গরু ও উটে সাত জনের পক্ষ থেকে জায়েজ, যখন সবার ইচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি হবে। চাই সবার একই কুরবত একই হোক ( যেমন সবাই কুরবানি দেয়ার নিয়তে শরিক হয়েছে) বা কুরবত ভিন্ন হোক ( যেমন, সাত শরিকে কেউ কুরবানি আবার কেউ আকিকা ইত্যাদি)
📚 আল মুহিতুল বুরহানি ৬/৯৮
সংশ্লিষ্ট মাসায়েল:
✓ বড় পশুতে সাত জন পর্যন্ত শরিক হওয়া সর্বসম্মতিক্রমে জায়েজ।
✓ বড় পশুতে সাত জনের অধিক ব্যাক্তি শরিক হওয়া সর্বসম্মতিক্রমে নাজায়েজ
✓ সাত জনের কম শরিক হওয়ার ব্যাপারে গ্রহনযোগ্য মত হলো জায়েজ।
📚ফাতওয়ায়ে উসমানী ৪/১১০-১১১
কুরবানির পশু ক্রয় করার পর কাউকে শরীক করার বিধান
যদি কোন সচ্ছল ব্যাক্তি কুরবানীর নিয়তে বড় পশু ক্রয় করে পরবর্তীতে অন্য কাউকে শরিক করে তাহলে কোরবানি সহিহ হবে তবে উত্তম হলো পশু ক্রয় করার আগে অংশীদার নেওয়া আর যদি কোন গরীব ব্যক্তি যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়,সে যদি কোন পশু কুরবানীর নিয়তে ক্রয় করে তাহলে সে ওই পশুতে অন্য কাউকে শরিক করতে পারবে না
📚ফাতওয়ায়ে শামী ৯/৪৫৯, বাদায়িউস সানায়ে ৭/৩০৭
ইমাম ফখরুদ্দিন কাজিখান আল হানাফী লিখেন
يجوز وهو قول علمائنا - رحمهم الله تعالى- وإذا جاز عندنا لا يجب التصدق بشئ من الثمن
অর্থাৎ কোন সচ্ছল ব্যক্তি একা কুরবানি দেয়ার জন্য বড় পশু ক্রয় করে পরবর্তীতে কাউকে শরীক করা জায়েয, আর এটা আমাদের হানাফী উলামায়ে কেরামের মত।আর যেহেতু আমাদের উলামায়ে কেরামদের মতে এভাবে শরিক করা জায়েয,তাই শরিকদের থেকে নেওয়া টাকা সাদকা করা আবশ্যক নয় ( তবে উত্তম হলো সাদকা করে দেয়া
📚কাজীখান ৩/২৩৭
যৌথ পারিবারিক কুরবানি:
✓আমাদের সমাজে অনেক যৌথ পরিবার রয়েছে, যারা যৌথভাবে ঘরের খরচ করে থাকেন। যেমন এক পরিবারে মা-বাবা সহ ৩ ভাই আছে। দেখা গেছে এই তিন ভাইয়ের উপর কুরবানি কুরবানী ওয়াজ আর মা-বাবার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয় এই তিন ভাইয়ের প্রত্যেকের উপর পৃথক পৃথকভাবে কোরবানি ওয়াজিব।
✓ এখন যদি যৌথ পরিবার হওয়ার কারণে একজন কোরবানি দেন তাহলে একজনেরই কোরবানি আদায় হবে যৌথ পরিবার হওয়ার কারণে অপর দুই ভাইয়ের পক্ষ থেকে কুরবানী আদায় হবে না।
বিষয়টা এমন যৌথ পরিবারের যারা প্রাপ্তবয়স্ক তাদের সবার উপর নামাজ ফরজ এখন যদি একজন নামাজ পড়েন আর বাকিরা নামাজ পড়েন না তাহলে যেভাবে সবার পক্ষ থেকে নামাজ আদায় হয় না তদ্রূপ কোরবানির বিষয়টা এমন।
✓ আবার অনেক সময় দেখা যায় মা বা বাবার পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়া হয়। সন্তানদের পক্ষ থেকে দেয়া হয় না অথচ তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব। এটাও আমাদের সমাজের একটি ভুল ধারণা যে মা-বাবার পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে সুতরাং সন্তানদের পক্ষ থেকেও আদায় হয়ে গেছে। অথচ বিষয়টা এমন নয় বরং মা-বাবার উপর যদি কোরবানি ওয়াজিব হয় তাহলে তাদের পক্ষ থেকে আদায় হবে সন্তানদের পক্ষ থেকে আদায় হবে না।
📚 ফাতওয়ায়ে উসমানী ৪/৮৯
সংশ্লিষ্ট আরো মাসায়েল:
✓ নাবালেগ শিশুর পক্ষ থেকে কুরবানী: যদি কোন পিতা কুরবানির পশুতে নিজের নাবালেগ সন্তানের পক্ষ থেকে নিজের খরচে কুরবানি দেন, তাহলে সমস্যা নেই। তবে এটা নফল হিসাবে আদায় হবে।
-শামী ৯/৪৫৮
মৃত মা বাবাকে ও নবিজীকে কুরবানীতে শরিক করা :
মৃত মা,বাবা অথবা অন্য কোন মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী জায়েয।
এমনকি নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে কুরবানী জায়েয।
📚আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল ৪/১৯৪
শরিকদের মাঝে কুরবানীর গোশত বন্টনের নিয়ম
সাত জন শরিক হলে সমান ভাবে বন্টন করতে হবে। কারো ভাগে এক সপ্তামাংশের কম হলে যেমন কারো অর্ধেক, কারো এক তৃতীয়াংশ, তাহলে কারো কুরবানি সহিহ হবে না।
আমাদের সমাজে অনেক অনুমানের ভিত্তিতে কুরবানির গোশত বন্টন করে থাকেন, যা সঠিক নিয়ম নয়। বরং গোশত বন্টনের সঠিক নিয়ম হলো - অংশিদার অনুযায়ী দাড়ি পাল্লা বা যে সব ডিজিটাল মাপ যন্ত্র আছে, এগুলো দিয়ে সমান ভাবে গোশত ভাগ করা, কেননা গোশত হলো রিবা জাতীয় মাল, অনুমানের ভিত্তিতে বন্টন হলে এদিক সেদিক হবেই,ফলা সুদের পর্যায়ে চলে যাবে।
তদ্রুপ সমস্ত শরিক যদি অনুমানের নির্ভর বন্টনের উপর একমত হয়, তারপরও এভাবে বন্টন করা বৈধ নয়, কেননা সুদ পর্যায়ে যা আছে,তা কারো অনুমোধনে হালাল হয় না।
তাছাড়া গোশত যেহেতু শরিকানা,তাই এ ধরনের অনুমুতিতে জানো হবে না। কেননা দান শুধুমাত্র একক মালিকানায় হয়ে থাকে।
আর পশুর যে সব অঙ্গ মেপে সবার মাঝে বন্টন করা অসম্ভব,যেমন মাথা,পা ইত্যাদি। এগুলোতে পরামর্শক্রমে কম বেশি করে বন্টন করা যাবে।
📚 ফাতওয়ায়ে শামী ৯/৪৬০
শরিক নেয়াতে সতর্কতা
কুরবানির পশুতে আমরা বিভিন্ন ভাবে শরিক হয়ে থাকি। কেউ ওয়াজিব কুরবানি আদায় করার জন্য আর কেউ আকিকা বা মান্নাত ইত্যাদির নিয়ত থাকে, এতে কোন সমস্যা নেই।
এসব নিয়তে কুরবানি পশুতে শরিক হলে কুরবানি সহিহ হবে।
তবে এমন ব্যাক্তির সাথে শরিক হওয়া যাবে না, যাদের মনে পশু জবেহ দ্বারা শুধুমাত্র একটা অংশ নেয়া উদ্দেশ্য থাকে, কোন ধরনের কুরবত বা ইবাদত উদ্দেশ্য হয় না,এমন হলে সবার কুরবানি বাতিল হয়ে যাবে।
ومنها أن لا يشارك المضحي فيما يحتمل الشركة من لا يريد القربة رأسا، فإن شارك لم يجز عن الأضحية
অর্থাৎ কুরবানির পশুতে এমন কাউকে শরীক করা যাবে না,যার কোন ধরনের কুরবতের ইচ্ছে নেই।যদি এমন এমন ব্যক্তিকে শরিক করা হয়, তাহলে কুরবানি বৈধ হবে না।
📚 বাদায়েউস সানায়ে ৬/৩০৫
প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে কুরবানী:
✓ অনেক প্রবাসী ভাই আছেন যারা দেশে কোরবানি দিতে ইচ্ছুক এক্ষেত্রে তারা কাউকে প্রতিনিধি বানিয়ে নিজের পক্ষ থেকে কুরবানী দিতে পারেন। কেননা পশু জবাইয়ের সময় কুরবানি দাতা উপস্থিত থাকা কুরবানি সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত নয়। বরং তা নফল।
👉 এখন প্রশ্ন একটি রয়ে যায়
যে দেশের মাটিতে কোরবানি দিবে ওই প্রবাসীর ঈদের নামাজের আদায়ের করার পর ঈদের নাকি বাংলাদেশের ঈদের নামাজ আদায় হওয়ার পর?
✍️ আমাদের দেখতে হবে কুরবানির পশু কোথায় আছে। কুরবানির পশু যেহেতু বাংলাদেশে,তাই বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রবাসীর পরিবারের এলাকায় ঈদের জামাত আদায় হয়ে গেলে উক্ত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়া যাবে।
এক্ষেত্রে ঐ প্রবাসী যদিও একদিন আগেই ঈদের জামাত আদায় করে নেয়।
যেমন সৌদি আরব ও বাংলাদেশ। প্রায় দেখা যায় সৌদি আরবে ঈদুল আযহার নামাজ আগেভাগেই হয়ে যায় আর বাংলাদেশ পরের দিন ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এখন প্রবাসী ব্যক্তি একদিন আগে ঈদের নামাজ পড়ে নিয়েছে আর বাংলাদেশের পরেরদিন হচ্ছে সুতরাং পশুর যবেহ হওয়ার স্থান তথা বাংলাদেশে ঈদের জামাত আদায় হওয়ার পর কোরবানি দিতে হবে এর আগের দিন নয়।
وهكذا ذكر محمد - عليه الرحمة - في النوادر وقال انما انظر الى محل الذبح ولا أنظر الى موضع المذبوح عنه….. بدائع الصنائع ٦/٣١١
📚 বাদায়েউস সানায়ে ৬/৩১১ ফাতওয়ায়ে উসমানী ৪/১০১, আল মুহিতুল বুরহানি ৬/৯১
হারাম টাকায় কুরবানির অংশীদার
কোরবানি ওয়াজিব হয় হালাল সম্পদে হালাল উপার্জনে,হারাম সম্পদ নেসাবের অন্তর্ভূক্ত নয়।
সুতরাং ব্যাংক থেকে যে টাকা লোন নিয়ে বা সুদের উপর ঋন করে,হারাম বস্তু যেমন মদ বিক্রি করে কুরবানি বৈধ নয়।
যদি নিশ্চিত ভাবে জানা যায় কোন অংশীদার হারাম উপার্জন দিয়ে কুরবানির অংশীদার হয়েছে, তাহলে কোন অংশীদারের কুরবানি সহিহ হবে না।
وإن كان شريك الستة نصرانيا أو مريد اللحم ،لم يجز عن واحد منهم لأن الإراقة لا تتجزأ (رد المحتار ٩/٤٧٢)
অনলাইনে কুরবানি:
আমাদের সমাজে অনলাইনে কোরবানি বলতে সেটাই বুঝিয়ে থাকেন যে দূর থেকে কোন ব্যক্তি, বা সংস্থা,সংগঠন ইত্যাদির মাধ্যমে পশু ক্রয় করে কুরবানী দেওয়া এক্ষেত্রে সতর্কতা থাকা খুবই জরুরি।
ফেসবুক সহ বিভিন্ন বিজ্ঞপ্তি মাধ্যমে আমরা অনলাইনে কুরবানীর এড পেয়ে থাকি যে কুরবানি দাতা এক বা একাধিক ভাগের অর্থ দেবে আর সংস্থা তাদের পক্ষ থেকে কুরবানী দিয়ে গরিবদের মাঝে গোস্ত বন্টন করে দিবে এটা জায়েজ আছে।
তবে এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত সংস্থা নির্বাচন করতে হবে যাতে করে তাদের ভুলের কারণে কোরবানি বিফলে না যায়।
📚 বাদায়েউস সানায়ে ৬/৩১১
হাসিল বা বাজার ফি ফাঁকি দেয়া:
হাট বাজার থেকে কুরবানি পশু ক্রয় করে হাসিল তথা বাজারের নির্ধারিত ফি না দেয়াতে কোরবানিতে কোন সমস্যা হবে না এটা উত্তম নয় তাই উচিত হল নি
র্ধারিত ফি দিয়ে দেওয়া। কেননা হাসিল না দেওয়ার কারণে তাদের হক নষ্ট হয়ে থাক,যা গুনাহের কাজ।
--------------------------------------------------
✍️ মুফতি ইকবাল মিসবাহ শ্রীমঙ্গলী
- ইমাম ও খতিব: কাঞ্চনপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ , বড়লেখা
- শিক্ষক: কাঞ্চনপুর দারুল উলুম কওমি মাদ্রাসা
- প্রচার সম্পাদক: মাজলিসুল ওয়ায়েজীন বাংলাদেশ (সিলেট বিভাগ)
বিঃদ্রঃ কপি না করার অনুরোধ রইলো।




0 Comments